চট্টগ্রাম, ১৫ মার্চ, রবিবার বেলা সাড়ে ১২ টর সময়,
চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত কালুরঘাট নতুন সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত দৃশ্যমান করার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
রবিবার (১৫ মার্চ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের বরাবর এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের তত্ত্বাবধানে এবং মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন-এর হাতে স্মারকলিপিটি তুলে দেন।
বিভাগীয় কমিশনার আন্তরিকতার সঙ্গে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন এবং উপস্থিত প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেন, চট্টগ্রামবাসীর এই গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি যথাযথ গুরুত্বসহকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেরণ করা হবে। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে এ প্রকল্পের গুরুত্বের বিষয়েও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি দ্রুত অগ্রসর হবে।
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের জীবনরেখা কালুরঘাট সেতু
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে শহরের যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হচ্ছে কালুরঘাট সেতু। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই সেতুটি এখন আর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহনকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, রাউজানসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নতুন একটি আধুনিক সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। এই দাবিকে সংগঠিত ও জনপ্রিয় জাতীয় দাবিতে পরিণত করতে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী কালুরঘাট
স্মারকলিপিতে আরো উল্লেখ করা হয়, কালুরঘাট সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই সেতুর নিকটেই অবস্থিত ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র, যেখান থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন।
সুতরাং নতুন সেতু নির্মাণ কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং এই ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা রক্ষা এবং জাতীয় স্মৃতিকে সম্মান জানানোর বিষয়ও বটে।
প্রকল্প অনুমোদন হলেও কাজ দৃশ্যমান নয়
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন, কালুরঘাট নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অজুহাতে—ডিজাইন পরিবর্তন, পুনঃডিজাইন, প্রশাসনিক জটিলতা—ইত্যাদির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পদ্মা সেতুর তুলনায় অনেক ছোট প্রকল্প
স্মারকলিপিতে তুলনামূলকভাবে উল্লেখ করা হয়, দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার বা ৬১৫০ মিটার। বিশাল ভূমি অধিগ্রহণ, নদীশাসন এবং জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়া সত্ত্বেও পদ্মা সেতু নির্মাণে সময় লেগেছে প্রায় আট বছর।
অন্যদিকে প্রস্তাবিত কালুরঘাট নতুন সেতুর দৈর্ঘ্য মাত্র প্রায় ৭০০ মিটার, যা পদ্মা সেতুর তুলনায় আট ভাগেরও কম। তাই যথাযথ পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যেই এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করা সম্ভব বলে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
দ্রুত কাজ শুরু ও কঠোর নজরদারির দাবি
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম আশা প্রকাশ করেছে যে, বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কালুরঘাট নতুন সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করবে এবং ২০২৮-২৯ সালের মধ্যেই সেতুটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা নেবে।
একই সঙ্গে অতীতের মতো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রিতা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা যেন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত না করে—সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নজরদারি ও নির্দেশনারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
স্মারকলিপি প্রদানকালে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ও মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ—কামরুল ইসলাম, মিঠুল দাশ, আবু তাহের চৌধুরী, মোহাম্মদ আলম মনসুর, মোহাম্মদ আক্তার, মিজানুর রহমান, রেক চৌধুরী, মোহাম্মদ রানা, এস.এম. জিয়াউর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইমরান, নুরুল হুদা, তসলিম খাঁ, হারুনুর রশিদ, মো. রাকিব, ওয়াহিদুল হক, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জাহিদসহ চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই স্মারকলিপি নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। এখন সবার প্রত্যাশা—সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কালুরঘাট নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করবে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।