এস.এম.মিজান উল্লাহ:- সাংবাদিকতা একটি সভ্য সমাজের আলোকবর্তিকা। যে সমাজে তথ্য গোপন থাকে, যেখানে সত্যকে আড়াল করা হয়, সেখানে সভ্যতার অগ্রগতি থেমে যায়। সংবাদমাধ্যম তাই শুধু সংবাদ পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের মধ্যে এক সেতুবন্ধন। একজন সাংবাদিক যখন মাঠে যান, তখন তিনি শুধু খবর সংগ্রহ করেন না বরং সমাজের অদেখা সত্যগুলো খুঁজে বের করেন। এই সত্য প্রতিষ্ঠার দায় থেকেই সাংবাদিকতা আজও গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সাংবাদিকতার পথচলা দীর্ঘ। ছাপাখানার আবিষ্কার ছিল তথ্য বিপ্লবের প্রথম ধাপ। ইউরোপের নবজাগরণ পর্বে সংবাদপত্র মানুষের চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে দৈনিক সংবাদপত্রের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা একটি পূর্ণাঙ্গ পেশায় রূপ নেয়। এরপর কালের পরিক্রমায় সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম—সবকিছুর সঙ্গেই সাংবাদিকতা এক মিশনে যুক্ত ছিল। সুস্থ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য, নিরপেক্ষতা এবং অনুসন্ধান। সাংবাদিকতা কখনো শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, বরং ঘটনার পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট এবং তার সামাজিক প্রভাব তুলে ধরার কলা। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিকতার নৈতিকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। তথ্য যাচাই, বিভিন্ন সূত্রের মতামত গ্রহণ, পর্যালোচনা, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ—এসব নিয়ম অনুসরণ করেই গড়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতা। বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার সূচক প্রতি বছর দেখায় কোন রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। যেখানে সাংবাদিকতা স্বাধীন সেখানে সমাজে বা স্বচ্ছতা বজায় থাকে ,রাষ্ট্রক্ষমতা জবাবদিহিতার আওতায় থাকে এবং জনগণের মতো প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়। কিন্তু যে দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সংকুচিত হয় সেখানকার গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় সংবাদপত্র ছিল মানুষের তথ্য জ্ঞানের প্রধান উৎস। পরবর্তীতে রেডিও টেলিভিশন এবং বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হওয়ায় সাংবাদিকতার বিস্তার বেড়েছে বহুগুণ। এখন সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না মুহূর্তের বেশি। এই গতির সঙ্গে এসেছে প্রতিযোগিতা আর সেই প্রতিযোগিতাই কখনো কখনো সংবাদমাধ্যমকে টেনে নিয়ে গেছে অপসংস্কৃতির দিকে।
এই অপসংস্কৃতির সবচেয়ে পরিচিত নাম হলো হলুদ সাংবাদিকতা। হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে দুই সংবাদপত্র মালিকের তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে। তারা পাঠক বাড়ানোর জন্য এমন সব শিরোনাম তৈরি করতে শুরু করেন যা ভয় উদ্বেগ বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এতে তথ্যের সত্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা উপেক্ষিত হতে থাকে। শিরোনাম বড় হতে থাকে সংবাদ ছোট হতে থাকে অথচ পাঠকের অনুভূতিকে উত্তেজিত করার কৌশল হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। হলুদ সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য সহজেই চেনা যায়। প্রথমত এতে অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত তথ্য যাচাই খুব কম দেখা যায়। তৃতীয়ত অজানা বা গোপন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে উত্তেজক সংবাদ তৈরি করা হয়। চতুর্থত অপরাধ যৌনতা রক্তক্ষয় স্ক্যান্ডাল ইত্যাদি বিষয় অধিক গুরুত্ব পায়। পঞ্চমত সংবাদকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে পাঠকের মনে আকস্মিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ইতিহাসে দেখা গেছে অতিরঞ্জিত সংবাদ কখনো কখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ানোর ক্ষেত্রে হলুদ সাংবাদিকতা অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সময়ের বড় উদাহরণ।সারসংক্ষেপে বলা যায় সাংবাদিকতা সমাজের বিবেক আর হলুদ সাংবাদিকতা সেই বিবেকের ওপর আঘাত। সুস্থ সংবাদমাধ্যম একটি জাতিকে আলোকিত করতে পারে আর অসুস্থ সংবাদমাধ্যম জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই আমাদের পথ দেখাবে উন্নত মানবিক সমাজের দিকে।